ফ্রিল্যান্সিং: ক্যারিয়ার গাইডলাইন 

ফ্রিল্যান্সিং: ক্যারিয়ার গাইডলাইন 

বেকারত্বের দেশে আশা জাগানিয়া একটি শব্দ হচ্ছে “ফ্রিল্যান্সিং”। চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নিজেকে ফ্রিল্যান্সিং করার মাধ্যমে সাবলম্বী করে তুলছেন।  ফ্রিল্যান্সিং এমন একটি পেশা যা মানুষের কর্ম ঘন্টাকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজের মতো করে ঘরে বসেই নির্দিষ্ট একটি কাজের মাধ্যমে আয় করতে পারেন। 

এখন আপনাদের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন আসছে

ফ্রিল্যান্সিং কি? 

ফ্রিল্যান্সিং হচ্ছে এমন একটি পেশা যার মাধ্যমে আপনি নির্দিষ্ট একটি দক্ষতা অর্জন করে ঘরে বসে নিজের মতো করে কাজ করতে পারবেন। আর সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এখানে অনেক কাজের ক্ষেত্রে রয়েছে। আপনার পছন্দ অনুযায়ী যে কোন একটি দক্ষতা অর্জন করে আপনি একজন ফ্রিল্যান্সার হয়ে যেতে পারেন। 

আজকে আমি এই পোস্টের মাধ্যমে আপনাদেরকে জানাবো ফ্রিল্যান্সিং কি, কেন করবেন এর আদ্যোপান্ত।

ফ্রিল্যান্সিং কেন করবেন? 

চাকরির মতো এই দৌড়ঝাঁপের বাজারে ফ্রিল্যান্সিং আপনাকে দিবে স্বস্তি ও বেকারত্বের হতাশা থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং শুরু করার আগে আপনার জানা উচিত যে আপনি কেন ফ্রিল্যান্সিং করবেন। 

স্বাধীন পেশা

ফ্রিল্যান্সিং একটি স্বাধীন পেশা। এখানে কর্ম ঘন্টা কতক্ষন হবে তা নির্ধারণ করার বস আপনি নিজেই! এখানে আপনার কাজের হিসাব কেউ চাইবেনা, আপনাকে ধমক দিবে না, আপনাকে নির্দিষ্ট গণ্ডির ভিতরে রেখে কাজ করাবে না। আপনিই আপনার কর্ম ঘন্টা নির্ধারণ করবেন। আপনি কতটুকু করতে চান, কতক্ষণ করতে চান, কিভাবে করতে চান এটা আপনার উপর নির্ভর করে। আর ফ্রিল্যান্সিং এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে এটি আপনি ঘরে বসে করতে পারবেন, এর জন্য আপনাকে কারো চোখের সামনে ডেস্ক আর টেবিলে বসে কাজ করতে হবে না। 

নিজেই নিজের বস

ফ্রিল্যান্সিংয়ে আপনি নিজেই নিজের বস! এখানে আপনার কাজে হস্তক্ষেপ করার মত কেউ আসবে না। এখানে কাজ দ্রুত করার জন্য কেউ আপনাকে তাড়া দিবে না। আপনি নিজের মতো করে কাজ করতে পারবেন। আপনার যখন ইচ্ছা আপনি ছুটি নিতে পারবেন, কারো কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে না যখন আপনার ছুটির প্রয়োজন। 

বিস্তৃত কাজের ক্ষেত্র

এখানে অনেক ধরনের কাজের ক্ষেত্র রয়েছে, একেকজন একেকটা বিষয়ে দক্ষ হয়ে কাজ করছেন। কেউ গ্রাফিক্স ডিজাইনিং করছেন, কেউ ওয়েব ডেভেলপিং, কেউ কন্টেন্ট রাইটিং, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং আরো অনেক অপার কাজের ক্ষেত্র রয়েছে এই ফ্রিল্যান্সিং – এ। 

এখানে দক্ষতাই সব!!

ফ্রিল্যান্সিং কাজের এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে আপনার একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড কত ভালো, আপনি কতগুলো ডিগ্রী অর্জন করেছেন, কি কি বিষয়ে আপনি ভালো ছিলেন, কতগুলো A+  আপনার রয়েছে কেউ দেখতে আসবে না! কিন্তু যেই কাজটা আপনার ক্লাইন্ট আপনাকে দিয়ে করাতে চাচ্ছেন সেই কাজে আপনি কতটা দক্ষ, কতটা ভালো এবং কতটা সূক্ষ্মতার সাথে করতে পারবেন সেই বিষয়টিই দেখা হবে এখানে। 

ফ্রিল্যান্সিং এর ভালো দিক

ফ্রিল্যান্সিং করার এমন কিছু বিশেষ দিক রয়েছে যা আপনাকে একজন ফ্রিল্যান্সার হয়ে উঠতে উৎসাহ দিবে। 

ক্লাইন্ট নির্বাচনের স্বাধীনতা

ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে হাজার হাজার ক্লায়েন্ট রয়েছে। এখানে আপনি কার সাথে কাজ করতে চাচ্ছেন, কার কাজ আপনার ভালো লাগবে এগুলো সবকিছুই আপনার উপর নির্ভর করে। আপনি যে ক্লায়েন্টের সাথে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করবেন আপনি তার সাথেই কাজ করতে পারবেন। 

কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণ

এখানে আপনি কতটা কাজের চাপ নিতে চাচ্ছেন বা আপনার কতটা ক্ষমতা রয়েছে সেটা পুরোপুরি আপনার উপরেই নির্ভর করে। এখানে অফিসের মতো মিটিং, অফিস পলিটিক্স বা অফিসের যেই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে একজন জব হোল্ডারকে যেতে হয় সেগুলোর কোন কিছুরই মুখোমুখি আপনি হবেন না।

বিভিন্ন ধরনের সুযোগ

আপনি যদি একটি ভাল ক্ষেত্রে দক্ষ হয়ে থাকেন তাহলে আপনার ক্লাইন্ট আপনাকে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ – সুবিধা দিবেন কাজ করার ক্ষেত্রে। এমনকি সার্কুলার মধ্যেও আপনি দেখতে পাবেন যখন আপনি কিছু কিছু বিষয়ে দক্ষ হবেন তখন আপনার কাজের ধরন আর দক্ষতা অনুযায়ী আপনার বেতন নির্ধারণ করা হবে। 

ফ্রিল্যান্সিং এর মন্দ দিক

সব কিছুরই ভালোর পাশাপাশি কিছু মন্দ দিক থাকে। ফ্রিল্যান্সিং এমন একটি পেশা এখানে মন্দের চেয়ে ভালোটাই বেশি। তারপরও কিছু খারাপ দিক তো রয়েই যায়।

সুবিধা কম

আপনি চাকরির মতো তেমন কোন সুবিধা পাবেন না এখানে যেমন: যারা চাকরি করেন তাদের ঈদ, পূজা ও বিভিন্ন উৎসবে তারা বোনাস পেয়ে থাকেন। অনেকের অফিস থেকে দুপুরের খাবার বা নাস্তা টাকা বা নাস্তার টাকা প্রদান করা হয়, বীমা করার সুবিধা এমনকি লোনও নেওয়া যায় কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং এর ক্ষেত্রে আপনি এই ধরনের কোন সুযোগ – সুবিধাই পাবেন না। 

অনিয়মিত কাজ

ফ্রিল্যান্সিং এর জগতে আপনাকে নিয়মিত কাজ খুঁজতে হয় এবং নতুন নতুন প্রজেক্টে কাজ করতে হয়। একটি কাজ আপনি ধারাবাহিকভাবে করতে পারেন না বা পারবেন না। অনেক সময় দেখা যায় যে প্রচুর কাজ হাতে থাকে আবার অনেক সময় আপনি কাজের মন্দায় ভুগবেন। 

বিভ্রান্তি 

যেহেতু ফ্রিল্যান্সিংয়ে আপনি নিজেই নিজের বস তাই এখানে অনেক ডিসট্রাকশন বা বিভ্রান্তি কাজ করে। যেহেতু পিছন দিক থেকে কেউ আপনাকে কাজ করার জন্য তাড়া দিচ্ছে না তারমানে আপনার ভিতরে একটা অলসতা বা অনীহা, অবহেলা কাজ করে কাজের প্রতি। এর ফলে নিজেকে সবসময় এক ট্রেকে রাখা সম্ভব হয় না ঐভাবে। 

টাকা না পাওয়ার ঝুঁকি

সকল কাজের ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু ঝুঁকি থেকেই যায় সেটি ব্যবসা বা চাকরি। আর ফ্রিল্যান্সিং এর ক্ষেত্রে এটি খুবই সাধারণ বিষয়। আপনি অনলাইনের মাধ্যমে একেবারে অচেনা, অজানা একজন ব্যক্তির কাজ করে দিচ্ছেন কাজ শেষে তিনি আপনার পেমেন্ট বা টাকাটা নাও দিতে পারেন। আর এই সকল বিষয় খুবই সাধারণ ফ্রিল্যান্সারদের কাছে। 

ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস

কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠার পর একজন ব্যক্তির প্রথম পদক্ষেপই হচ্ছে কাজ খোঁজা এবং কাজ শুরু করা। আর এই জন্য চাই কাজের ক্ষেত্র। একজন ফ্রিল্যান্সার নতুন হিসেবে যে যে সাইটগুলোতে কাজের জন্য আবেদন করতে পারেন:

আপওয়ার্ক

অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসের মধ্যে সবচেয়ে উপরে রয়েছে upwork। upwork এ ৫৯ মিলিয়ন নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সার রয়েছে যারা প্রতিনিয়ত তাদের দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। 

ক্লায়েন্ট এবং  ফ্রিল্যান্সারদের কাজের উপর এই মার্কেটপ্লেসটি প্রতিটি কাজে ২০% ফি চার্জ করে। 

ফাইবার

ফাইবারে একজন ফ্রিল্যান্সার নিজের প্রোফাইল ও কাজের দক্ষতাগুলো তুলে ধরার এবং সেভাবেই একজন ক্লাইন্ট তাদেরকে নিজের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের জন্য হায়ার করে থাকেন। এখানৈ দক্ষতার উপর বিভিন্ন ধরনের গিগ তৈরি হয়, আর এই গিগের মাধ্যমে আপনি কাজ পাবেন। তাই একজন ফ্রিল্যান্সারকে চমৎকারভাবে তার গিগগুলো ফুঁটিয়ে তুলতে হয় কাজ পাওয়ার জন্য।

People per hour

পিপল পার আওয়ার একটি বিশ্বস্ত ফ্রিল্যান্স সাইট। সারা বিশ্বের সকল ফ্রিল্যান্সারদেরকে সংযুক্ত করার জন্য ২০০৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি শুরু হওয়ার পর থেকে ৮৯ টিরও বেশি দেশে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ১.১ মিলিয়নেরও বেশি চাকরির জন্য পোস্ট করা হয়েছে। 

ফ্রিল্যান্সার 

ফ্রিল্যান্সার ওয়েবসাইট এমন একটি সাইট যেখানে একজন ক্লাইন্ট ফ্রিল্যান্সারকে এবং ফ্রিল্যান্সার ক্লাইন্টকে সহজে খুঁজে পেতে পারে নির্দিষ্ট কাজের জন্য। এখানে প্রতিটি কাজের জন্য ফ্রিল্যান্সার ও ক্লাইন্টকে ১০% ফি প্রদান করতে হয়। ২৪৭ টিরও বেশি দেশ এবং অঞ্চল এই সাইটটি ব্যবহার করছেন নিয়মিত নতুন নতুন কাজ সন্ধানের উদ্দেশ্যে। 

ফ্রিল্যান্সিং কাজ

ফ্রিল্যান্সিং অপার এক কাজের ক্ষেত্র। এখানে নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে আপনি দক্ষ হয়ে কাজ শুরু করতে পারবেন। এখানে যেই ধরনের কাজগুলো আপনি করতে পারেন: গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, ওয়েব ডেভেলপিং, এপ তৈরি, কনটেন্ট রাইটিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, ইডিটর, সোশ্যাল মিডিয়া স্পেশালিস্ট, ভিডিও ইডিটর, কপিরাইটিং, ই-বুক রাইটার, ফটোগ্রাফার, ওয়েব ডিজাইনার এবং আরো অনেক অনেক ক্ষেত্রে। 

ফ্রিল্যান্সিং করে আয়

ফ্রিল্যান্সিং আপনার কাজকে যেমন সহজ আর আরামদায় করে দেয় ঠিক তেমনি এখানে আয়ের পরিমাণটাও বেশ উপরের দিকে! সাধারণত একজন ফ্রিলেন্সার কি পরিমান আয় করে থাকেন চলুন এই বিষয়ে একটু আইডিয়া না যাক।

একজন ফ্রিল্যান্সার কি পরিমান আয় করবেন এটি নির্ভর করে তার কাজের দক্ষতা ও পরিমাণের উপর। একজন ফ্রিল্যান্সার ঘন্টায় সাধারণত ২০ থেকে ২৫ ডলার আয় করে থাকেন এবং যার বার্ষিক মূল্যমান ৩২ হাজার মার্কিন ডলার। একজন ভালো মানের দক্ষ ফ্রিল্যান্সার ৫০ ডলার থেকে শুরু করে এর বেশিও আয় করে থাকেন। 

ফ্রিল্যান্সিং কাজ যেভাবে শিখবেন?

অন্যান্য কিছু শেখার মত ফ্রিল্যান্সিং কাজটাও আপনাকে শুরুতে শিখেই শুরু করতে হবে এছাড়া কিন্তু আপনি কাজ পাবেন না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে ফ্রিল্যান্সিং আসলে শিখবেন কিভাবে? 

বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং শেখা বেশ সহজ। আপনি অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের কোর্স পাবেন বিভিন্ন বিষয়ের উপরে। আর এই সকল কোর্সের বিভিন্ন সুবিধা থাকে, কোর্স শেষেও আপনি বিভিন্ন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা পাবেন এমন অনেক কোর্সও রয়েছে যেমন: ইশিখন ডটকম। 

ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস কাজ এবং ক্লাইন্ট পাওয়ার উপায়

ফ্রিল্যান্সিং একটি বিস্তর মার্কেটপ্লেস এখানে কাজ করার জন্য অবশ্যই আপনাকে কিছু নিয়ম কানুনের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। এর জন্য প্রথম বিষয়টি হচ্ছে আপনাকে বেশ দক্ষ হতে হবে ঐ কাজে যেই কাজটি আপনি করতে যাচ্ছেন।  

এরপরে আপনাকে একটি পোর্টফোলিও তৈরি করতে হবে নিজের যার মাধ্যমে একজন বায়ার বা ক্লায়েন্ট বুঝতে পারবেন যে আপনি কোন বিষয়ে দক্ষ এবং কি কি যোগ্যতা রয়েছে আপনার ঐ কাজটি করার। আপনার দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ীই পরবর্তীতে বায়ার নিজের চাহিদা মত আপনাকে তার কাজের জন্য হায়ার করবেন। 

পরিশেষে 

জীবনের একটা লম্বা সময় আমরা কাটিয়ে দেই পড়াশুনা করার জন্য। তারপরও দেখা যায় যে ভুরি ভুরি সার্টিফিকেট নিয়েও আমরা চাকরি পাচ্ছি না এই প্রতিযোগিতা বাজারে। এরপরে আমাদের মাঝে দেখা দেয় মানুষিক অবসাদ, পারিবারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক দুর্দশা ও আরো সমস্যা। আর এই সকল সমস্যার সমাধানে আপনার জীবনে আশীর্বাদ হতে পারে ফ্রিল্যান্সিং। কয়েক মাসের ব্যবধানে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ হয়ে আপনি খুব ভালো পরিমাণ আয় করতে পারবেন। একটি বিষয় দক্ষ হতে কিন্তু খুব বেশি সময় লাগে না সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৭ মাস। তো কিসের জন্য অপেক্ষা করছেন? এখনই সময় হাজার হাজার ফ্রিল্যান্সারদের তালিকায় নিজের নামটি যোগ করার! 

admin

admin

My name is Md Masudur Rahman. I’m a believer, I’m a dreamer and I’m a doer. I am well known in content creation, Presentation & Leadership skill. I can speak very well both in Bengali and English.

One thought on “ফ্রিল্যান্সিং: ক্যারিয়ার গাইডলাইন 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।